Sunday, 31 August 2025

বাত ব্যথা (Joint Pain / Arthritis)

Leave a Comment

 বাত ব্যথা (Joint Pain / Arthritis)


লক্ষণসমূহ:

বাত ব্যথার প্রধান লক্ষণগুলো হলো:


সংযোগস্থলে ব্যথা, বিশেষ করে হাত, পা, কোমর ও হাঁটু


জয়েন্টে গিঁটে বা ফোলা অনুভূত হওয়া


সকালে বা বিশ্রামের পরে জয়েন্টে কঠোরতা


হালকা স্পর্শেও ব্যথা বৃদ্ধি


হাঁটাচলায় অসুবিধা, দেহ ভারী বোধ


রাতে ঘুমে বিঘ্ন, শারীরিক দুর্বলতা



প্রধানত অতিরিক্ত ঠান্ডা, আর্দ্রতা, জয়েন্টে দীর্ঘকাল চাপ, বয়স বৃদ্ধি, এবং শরীরের তেজ-শক্তি হ্রাসের কারণে বাত ব্যথা দেখা দেয়।



---


হোমিওপ্যাথিক ঔষধসমূহ


1. রাস টক্স (Rhus Toxicodendron)


হাত ও পায়ের জয়েন্টে ব্যথা, সকালে কঠোরতা


হাঁটার পরে ব্যথা কমে, বিশ্রামের পরে বাড়ে


জয়েন্ট ফোলা, হালকা গরম ভাব

Antidote: অ্যাসক্লেপিয়াস, কফি, ক্যামফর

পরবর্তী ঔষধ: রম, নক্স ভমিকা, সেলেনিয়াম, লাইকো



2. অ্যাসক্লেপিয়াস (Asclepias tuberosa)


হাড় ও জয়েন্টে তীব্র ব্যথা


শারীরিক পরিশ্রমে ব্যথা বাড়ে


ব্যথার সঙ্গে জয়েন্টে ফোলা ও উত্তেজনা

Antidote: স্ট্যানম, কফি

পরবর্তী ঔষধ: রস টক্স, নক্স, সলফ, আর্সেনিকাম



3. ক্যালকেরিয়া কার্ব (Calcarea Carbonica)


বড়ো জয়েন্টে ব্যথা ও শক্তি হ্রাস


হাঁটাচলায় অসুবিধা, বিশেষ করে ধাপে ধাপে উঠতে কষ্ট


ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি

Antidote: স্ট্যানম, জেলসিমিয়াম

পরবর্তী ঔষধ: ফসফরাস, সলফ, নক্স



4. ফসফরাস (Phosphorus)


সংযোগস্থলে জ্বালা ও অস্বস্তি


রাতে ঘুম বিঘ্ন, হাত-পা ঝিমঝিম


হালকা স্পর্শেই ব্যথা বাড়ে, বিশ্রামের পরে ব্যথা কমে

Antidote: ক্যামফর, চায়না

পরবর্তী ঔষধ: রাস টক্স, নক্স, সেলেনিয়াম




---


ডিসক্লেমার


উপরের তথ্য শুধুমাত্র সাধারণ শিক্ষামূলক ও তথ্যবহুল উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য যোগ্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।


Read More

হোমিওপ্যাথিক ওষুধ: Aconite Nap(একোনাইট)

Leave a Comment

 🌿 হোমিওপ্যাথিক ওষুধ: Aconite (একোনাইট)

---

🔹 পরিচয়


Aconite হলো হোমিওপ্যাথির একটি গুরুত্বপূর্ণ Acute remedy, যা বিশেষ করে হঠাৎ অসুস্থতা, জ্বর, আতঙ্ক, উদ্বেগ এবং বাত/ঠাণ্ডাজনিত ব্যথা ও পেশী/জয়েন্টের ব্যথাতে কার্যকর।


উৎস:


1. Boericke, W. F. Pocket Manual of Homeopathic Materia Medica, 1927.



2. Kent, J. T. Lectures on Homeopathic Materia Medica, 1900.



3. Allen, T. F. Encyclopedia of Pure Materia Medica, 1874.


---

🔹 মানসিক লক্ষণ (Mental Symptoms)


হঠাৎ ভয়, আতঙ্ক, অস্থিরতা


একা থাকতে চাওয়া, অপরিচিতদের থেকে দূরে থাকা


অল্প ঘটনায় দুশ্চিন্তা বা চিৎকার করা


ঘুমের ব্যাঘাত, উত্তেজনা, মনোযোগের অভাব


মানসিক চাপের সঙ্গে শারীরিক অসুস্থতা বেড়ে যায়


---

🔹 শারীরিক লক্ষণ (Physical Symptoms)


🔸 জ্বর ও দুর্বলতা


হঠাৎ জ্বর ওঠা, ঠাণ্ডা হাত-পা


কম্পন বা শীতের সংস্পর্শে অসুস্থতা বৃদ্ধি


ক্লান্তি ও দুর্বলতা



🔸 সর্দি, কাশি ও শ্বাসযন্ত্র


হঠাৎ শুরু হওয়া শুকনো বা আর্দ্র কাশি


শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস দুর্বল বা সংক্রমণের ঝুঁকি


বুক ব্যথা বা ধড়ফড়



🔸 পেশী ও জয়েন্টের ব্যথা (Pain & Rheumatism)


ঠাণ্ডা বা বাতের সংস্পর্শে পেশী ও জয়েন্ট ব্যথা বেড়ে যায়


হঠাৎ পেশী ব্যথা বা টান, বিশেষ করে হাত-পা ও কোমরে


ব্যথার সঙ্গে অস্থিরতা ও দুর্বলতা



🔸 হজম ও পেট


অল্প খাবার গ্রহণ করলে অসুবিধা, মাঝে মাঝে বমি


জ্বালা-জ্বালা অনুভূতি পাকস্থলী বা প্রস্রাবে



🔸 ত্বক ও সংবেদনশীলতা


ঠাণ্ডা লাগলে ত্বক নীলচে বা ফিকে


ঠাণ্ডা বা গরমে অস্বস্তি, সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি


---

🔹 প্রধান ব্যবহার ক্ষেত্র (Indications)


হঠাৎ জ্বর, সর্দি-কাশি, ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতা


আতঙ্ক, হঠাৎ ভয়, অস্থিরতা


বাত বা ঠাণ্ডাজনিত পেশী ও জয়েন্ট ব্যথা


হঠাৎ শারীরিক ব্যথা (পেট, পেশী, জয়েন্ট)


শ্বাসকষ্ট বা ফ্লু শুরু হলে


---

🔹 Keynotes (বিশেষ বৈশিষ্ট্য)


✅ Sudden onset → হঠাৎ শুরু হওয়া অসুস্থতা

✅ Fear & Anxiety → আতঙ্ক, ভয়, অস্থিরতা

✅ Chilly & Restless → হাত-পা ঠাণ্ডা, অস্থিরতা

✅ Dry cough → শুকনো বা আর্দ্র কাশি

✅ Pain & discomfort → বাত বা ঠাণ্ডাজনিত পেশী/জয়েন্ট/পেট ব্যথা


---

🔹 পোটেন্সি ও ব্যবহার


30C → হালকা জ্বর, ঠাণ্ডা, হঠাৎ অসুস্থতা, বাত-ব্যথা (প্রতি ৩–৪ ঘণ্টা ২–৩ ডোজ, লক্ষণ কমলে বন্ধ)


200C → গুরুতর হঠাৎ জ্বর, আতঙ্ক, ফ্লু, বাত বা পেশীর ব্যথা (১–২ ডোজ যথেষ্ট)


1M → তীব্র দুর্বলতা বা হঠাৎ গুরুতর শারীরিক সমস্যা/ব্যথা (একবারের ডোজ)


---

🔹 মিক্সোপ্যাথি (Comparisons & Relationships)


ধাপ/অবস্থা ওষুধ বিশেষ বৈশিষ্ট্য


হঠাৎ ভয় ও জ্বর Aconite শুরুতেই হঠাৎ জ্বর ও আতঙ্ক

মাথা লাল, তীব্র ব্যথা Belladonna মাথা লাল, চোখ লাল, ধুকপুক ব্যথা

শুকনো কাশি, বুক ব্যথা Bryonia নড়লেই ব্যথা বাড়ে, তৃষ্ণা বেশি

বারবার জ্বর, দুর্বলতা Arsenicum Album জ্বলন, বারবার জ্বর ওঠা-নামা, অস্থিরতা

বাত বা ঠাণ্ডাজনিত জয়েন্ট/পেশী ব্যথা Rhus Toxicodendron নড়লেই ব্যথা কমে, বাতের সংস্পর্শে ব্যথা বৃদ্ধি


---


⚠️ সতর্কতা (Precautions)


হঠাৎ জ্বর, ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতা ও বাত/পেশী ব্যথার জন্য ব্যবহার।


অতিরিক্ত ডোজ এড়িয়ে চলুন।


শিশু, গর্ভবতী ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।


Self-medication এড়াতে হবে।


---


📌 Disclaimer

The information on this website is provided for educational purposes only. It is not a substitute for professional medical advice, diagnosis, or treatment. Always consult a qualified healthcare provider for medical guidance.


Read More

হোমিওপ্যাথিক ওষুধ: Arsenicum Album (আর্সেনিকাম অ্যালবাম)

Leave a Comment

 🌿 হোমিওপ্যাথিক ওষুধ: Arsenicum Album (আর্সেনিকাম অ্যালবাম)



---


🔹 পরিচয়


Arsenicum Album হলো হোমিওপ্যাথির একটি গুরুত্বপূর্ণ Acute ও Sub-acute remedy, যা বিশেষ করে দুর্বলতা, বারবার জ্বর ওঠা–নামা, জ্বালা-জ্বালা অনুভূতি এবং উদ্বেগের সঙ্গে শারীরিক অসুস্থতায় কার্যকর।


উৎস:


1. Boericke, W. F. Pocket Manual of Homeopathic Materia Medica, 1927.



2. Kent, J. T. Lectures on Homeopathic Materia Medica, 1900.



3. Allen, T. F. Encyclopedia of Pure Materia Medica, 1874.





---


🔹 মানসিক লক্ষণ (Mental Symptoms)


অস্থিরতা, অতিমাত্রা উদ্বেগ ও ভয়


“আমি ঠিক হতে পারব না” ভাব, মৃত্যুভয়


অসুস্থতার সময় একা থাকতে চাওয়া, অন্যদের কাছে ভয়ানক আচরণ


perfectionism বা সবকিছু ঠিকভাবে না হওয়া নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ


মানসিক চাপের সঙ্গে শারীরিক অসুস্থতা বেড়ে যায়




---


🔹 শারীরিক লক্ষণ (Physical Symptoms)


🔸 জ্বর ও দুর্বলতা


বারবার জ্বর ওঠা-নামা


শরীর দুর্বল, ক্লান্ত, হাত-পা ঠান্ডা


অল্প কিছুতে থকথকে ঘেমে যাওয়া বা ঠান্ডা লাগা


প্রচণ্ড তৃষ্ণা, জল খেতে চায়



🔸 হজম ও পেট


ডায়রিয়া বা বমি, মাঝে মাঝে রক্তমিশ্রিত


জ্বালা-জ্বালা অনুভূতি পাকস্থলীতে, গলার ভেতর বা প্রস্রাবে


ক্ষুধা কম, খাবার সামান্য গ্রহণ করে



🔸 শ্বাসযন্ত্র


দীর্ঘস্থায়ী শুকনো বা আর্দ্র কাশি


শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস দুর্বল বা সংক্রমণের ঝুঁকি


বুকের ব্যথা ও ধড়ফড়



🔸 ত্বক ও সংবেদনশীলতা


ত্বক শুষ্ক, ঠান্ডা লাগলে রঙ ফিকে বা নীলচে


সংবেদনশীলতা বাড়ে → ঠান্ডা বা গরমে অস্বস্তি




---


🔹 প্রধান ব্যবহার ক্ষেত্র (Indications)


বারবার জ্বর ওঠা-নামা, দুর্বলতা, ক্লান্তি


অ্যাসিডিটি, জ্বালা, পেটের ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য


দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া বা ফুসফুস দুর্বলতা


খাদ্য বিষক্রিয়া বা ডায়রিয়া


ঠান্ডা, কাশি ও ফ্লু (পুনরাবৃত্তি হলে)


মানসিক অস্থিরতা ও ভয়, বিশেষ করে অসুস্থতার সময়




---


🔹 Keynotes (বিশেষ বৈশিষ্ট্য)


✅ Anxiety & Restlessness → অস্থির ও ভয়ানক অবস্থা

✅ Burning pains → পাকস্থলী, গলা, প্রস্রাবের জ্বালা

✅ Chilly & Weak → হাত-পা ঠান্ডা, শক্তি কমে যাওয়া

✅ Frequent vomiting / diarrhea → বারবার সমস্যা

✅ Desire for small sips of water → ছোট ছোট ঠান্ডা পানি খেতে চায়



---


🔹 পোটেন্সি ও ব্যবহার


30C → হালকা জ্বর, দুর্বলতা, বারবার ডায়রিয়া (প্রতি ৩–৪ ঘণ্টা ২–৩ ডোজ, লক্ষণ কমলে বন্ধ)


200C → দীর্ঘস্থায়ী ফ্লু, ফুসফুস দুর্বলতা, বারবার জ্বর (১–২ ডোজ যথেষ্ট)


1M → তীব্র দুর্বলতা বা গুরুতর জ্বালা-জ্বালা সমস্যা (একবারের ডোজ)




---


🔹 মিক্সোপ্যাথি (Comparisons & Relationships)


ধাপ/অবস্থা ওষুধ বিশেষ বৈশিষ্ট্য


হঠাৎ ভয় ও জ্বর Aconite শুরুতেই হঠাৎ জ্বর ও আতঙ্ক

মাথা লাল, তীব্র ব্যথা Belladonna মাথা লাল, চোখ লাল, ধুকপুক ব্যথা

শুকনো কাশি, বুক ব্যথা Bryonia নড়লেই ব্যথা বাড়ে, তৃষ্ণা বেশি

বারবার জ্বর, দুর্বলতা Arsenicum Album জ্বলন, বারবার জ্বর ওঠা-নামা, অস্থিরতা

দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুস দুর্বল Phosphorus রক্তমিশ্রিত কাশি, ফুসফুস দুর্বলতা




---


⚠️ সতর্কতা (Precautions)


Arsenicum Album মূলত বারবার জ্বর ওঠা-নামা, দুর্বলতা ও জ্বালা-জ্বালা অনুভূতিতে ব্যবহার হয়।


ডোজ অতিরিক্ত দেওয়া যাবে না।


শিশু, গর্ভবতী ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ দরকার।


Self-medication এড়িয়ে চলুন।




---


📌 Disclaimer

The information on this website is provided for educational purposes only. It is not a substitute for professional medical advice, diagnosis, or treatment. Always consult a qualified healthcare provider for medical guidance.

Read More

Sunday, 5 January 2025

হোমিও ঔষধ: আর্জেন্ট মেটালিকাম (Argent Met.)

Leave a Comment

 আর্জেন্ট মেটালিকাম (Argent Met.)

(খাঁটি রূপা হইতে প্রস্তুত হয়) মাহাত্মা হ্যানিম্যান ইহা প্রথমে পরীক্ষা করেন। হিষ্টিরিয়াগ্রস্তা, নার্ভাস-স্ত্রী ও যে সকল পুরুষ শুক্রক্ষয় করিয়া অত্যন্ত দুর্ব্বল হইয়া পড়িয়াছে তাহাদের ধাতুতে ইহা অধিক উপকারী। পরিপাক যন্ত্রের ও অন্যান্য স্থানের মিউকাস মেম্বেণের এবং হাড়, কার্টিলেজ, লিগামেন্ট, লেরিংস ও মূত্রযন্ত্রের উপর ইহার প্রধান ক্রিয়া।


চরিত্রগত লক্ষণ:


১। রোগী-রোগা, লম্বা ও উত্তেজিত স্বভাবাপন্ন।


২। অণ্ডকোষে থেঁৎলাইয়া যাইবার মত বেদনাবোধ করিলে এবং লিঙ্গোত্থান না হইয়া অজ্ঞাতসারে শুক্রপাত বা স্বপ্নদোষ হইলে ইহাতে উপকার হইবে। পুরাতন গ্লীটরোগে ঘন স্রাব্ নির্গত হয়, বঙ্ হলদে বা সবুজ, জ্বালা যন্ত্রণা থাকে না (হাইড্র্যাস্টিস)।

৩। গায়ক ও বক্তাদের গলাধরা। 


৪। কাশি-ফ্যারিংস, লেরিংস কিম্বা ব্রঙ্কাইয়ের কোন পুরাতন পীড়ায় জেলির মত শ্লেষ্মা জড়াইয়া থাকে, রোগী উহা পুনঃ পুনঃ কাশিয়া তুলিয়া ফেলিবার চেষ্টা করে। জোরে হাসিলে বা পাঠ করিলেই কাশি হয়।


৫। কাশিতে কিংবা গিলিতে গলায় বেদনা। 


৬। জেলীর মত চট্টচটে সর্দি গলায় জমে; কিন্তু উহা সহজেই উঠিয়া যায়।


৭। নাসিকায় জলের মত তরুণ সর্দ্দিসহ হাঁচি।


৮। ঋতুলোপকালের বয়সে অত্যাধিক রজঃস্রাব।


৯। বাম ওভেরিতে বেদনা, বেদনাসহ জরায়ুর বহির্নিঃসরণ (ডান ওভেরিতে-প্যালেডিয়ম) Froded spongy cervix ।


১০। বামদিকের বক্ষে অত্যন্ত দুর্ব্বলতা অনুভব। 


১১। অবসাদ-সর্বদা ঘুমাইবার ইচ্ছা।


ইহার রোগীর পা ফোলা থাকে, হাঁটুতে কিছুমাত্র বল থাকে না, প্রত্যেক দিন হেক্টিক-জরের মত-বেলা ১টায় জ্বর আসে এবং ২/১ ঘণ্টা থাকিয়া ছাড়িয়া যায়, স্মরণশক্তির লোপ হয়, কথা কহিতে কহিতে ভুলিয়া যায় ও চুপ করিয়া থাকে, প্রকৃত বয়স অপেক্ষা অনেক অধিক বয়স বলিয়া বোধ হয়, স্বভাব খিটখিটে, কাহারও সঙ্গে কথা কহিতে ভালবাসে না, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তাবশতঃ এক স্থানে থাকিতে পারে না।


১২। বেদনা-শরীরের যে কোন স্থানে হউক বেদনা হইয়া (অধিকাংশ স্কুলে বাম দিকে) উহা ক্রমশঃ মস্তক পর্যন্ত উত্থিত হয়, বেদনা ধীরে ধীরে বাড়ে, চরম সীমায় উত্থিত হয়, পরে হঠাৎ কমিয়া যায়।
১৩। বাতে গাঁট, কনুই ও হাঁটু আক্রান্ত হয়। পায়ের ভীষণ দুর্ব্বলতা-পা কাঁপে, সম্মুখবাহুর আংশিক পক্ষাঘাত, গোড়ালির ফোলা, লেখকদিগের আঙুল কাঁপে (writer's cramp), পিঠে বেদনা, কুঁজো হইয়া চলে।


১৪। মিষ্টি গন্ধের প্রস্রাব অনবরত বেশি পরিমাণে হয়। 
১৫। রোগী চিৎ হয়ে শুলে তার হৃদযন্ত্রের স্পন্দন ও ফরফড়ানি বেড়ে যায় তবে ব্যথা করে না।


বৃদ্ধি-স্পর্শে, দুই প্রহরে।


উপশম-খোলা বাতাসে, কাশিলে, কাশি রাত্রিতে শুইলে (হায়ো- সিয়ামসের বিপরীত লক্ষণ)। 


পরবর্তী ঔষধ-ক্যাল্কে, পল্স, সিপি


শক্তি: ৬ -৩০ ও ২০০


প্রয়োগ: প্রতিদিন ৩-৪ বার।


অতি শীঘ্র পুন: প্রয়োগ নিষিদ্ধ।


Read More

Sunday, 31 March 2024

এবিস নায়গ্রা (Abies Nigra) Homeo Remedy

Leave a Comment

 এবিস নায়গ্রা (Abies Nigra)


(আমেরিকার ঝাউগাছের মত একপ্রকার গাছের আঠা হইতে প্রস্তুত)

ক্রিয়া: ইহা একটি দীর্ঘক্রিয় ঔষধ এবং পাকস্থলীর উপরেই ইহার ক্রিয়া অধিক। কোনও পীড়ার সহিত বায়ু ও অম্লের লক্ষণ থাকিলে, বৃদ্ধদের অম্ল ও অজীর্ণ পীড়ার সহিত হৃৎপিণ্ডের কোনও পীড়া থাকিলে এবং অতিরিক্ত চা পান ও তামাক খাওয়ার জন্য ডিস্পেপসিয়া পীড়া হইলে- ইহাতে অধিক উপকার হয়। নার্ভাস, লেখাপড়ার কার্য্য বা চিন্তা করিবার ক্ষমতালোপ দিবসে নিদ্রালু-রাত্রিতে অনিদ্রা, কোষ্ঠবদ্ধতা, আহারের পর পেটে বেদনা, ভুক্তদ্রব্য পেটে গোলার মত হইয়া থাকা কিম্বা জড়াইয়া উঠা, বেদনা প্রভৃতি ইহার-চরিত্রগত লক্ষণ।


অম্লশূল-বেদনা-একটু পেট ভরিয়া আহার করিলেই পেটে এক- প্রকার যন্ত্রণাদায়ক বেদনা উপস্থিত হয়, মনে হয় পাকস্থলীর মুখে (in- cardia) যেন কি একটা গোলার মত শক্ত পদার্থ আটকাইয়া আছে। এবিসের রোগীর এক অদ্ভুত লক্ষণ-বেলা দ্বিপ্রহরে ও রাত্রিতে অত্যন্ত ক্ষুধা হয়, এমন কি ক্ষুধার জন্য নিদ্রা হয় না; কিন্তু প্রাতঃকালে কিছুমাত্র ক্ষুধা থাকে না।


হৃৎপিণ্ডের পীড়া-বুকের ভিতর একপ্রকার যন্ত্রণা হয় ও সেখানে বোধ হয় যেন কিছু আটকাইয়া আছে, রোগী তাহার জন্য পুনঃ পুনঃ কাশে, কাশির সময় মুখ দিয়া অনবরত জল উঠে, গলা যেন কেহ চাপিয়া ধরিয়াছে, তাহাতে দম বন্ধ হইয়া যাইবে এইরূপ বিবেচনা হয়। হৃৎপিণ্ডে তীক্ষ্ণ বেদনা, হৃৎপিণ্ড ভারী ও হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া ধীর হয়।


ঋতুস্রাব-দুই তিন মাস অন্তর হয় ও পুনরায় বন্ধ হইয়া যায়। 

সম্বন্ধ (complements) -ব্রায়োনিয়া, নক্স, থুজা, ক্যালি-কার্ব্ব। 

বৃদ্ধি (aggravation)-আহারের পরক্ষণেই।


শক্তিPotency)-১ম হইতে ৩০ শক্তি। 

প্রয়োগ: প্রতিদিন ৩/৪ বার





Read More

স্নায়ু দৌর্ব্বল্য (Nerve weakness ) এর হোমিও চিকিৎসা

Leave a Comment

 স্নায়ু দৌর্ব্বল্য (Nerve weakness )

স্নায়ু দৌর্ব্বল্য: মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা, ইন্দ্রিয় গণের অবসন্নতা, পেট ফাঁপা, অজীর্ণ, হাত পা ঝিমঝিম করা, স্মৃতিশক্তি লোপ, কোন বিষয়ে চিন্তা করতে না পারা, কথা কহিতে অনিচ্ছা, অনিদ্রা, মানসিক অবসাদ ইত্যাদি এই পীড়ার লক্ষণ।


এসিড ফস 30/200: স্নায়ু-দৌৰ্ব্বল্য—মাথাব্যথা, মাথাঘোরা, বুক ধড়ফড়, করা, ইন্দ্রিয়গণের অবসন্নতা, পেটফাপা, অজীর্ণ, হাত পা ঝিম-ঝিম করা, স্মৃতি- শক্তির লোপ, কোন বিষয় চিন্তা করিতে না পারা, কথা কহিতে অনিচ্ছা, অনিদ্রা, ভয়, মানসিক অবসাদ ইত্যাদি এই পীড়ার লক্ষণ এবং এনাকার্ডিয়াম, আর্জেণ্ট-নাইট্রিকাম, এম্ব্রাগ্রেসিয়া এসিড-পিক্রিক, 'ক্যালি-ব্রোম, জিঙ্কাম, ফসফরাস, এসিড ফস, জেলসিমিয়ম, মস্কাস ইত্যাদি লক্ষণভেদে উহার সাধারণ ঔষধ। ফস্ফরিক এসিডের রোগী সাময়িক পরিশ্রমেই দুর্ব্বলতা অনুভব করে, রমণেচ্ছা অত্যন্ত প্রবল থাকে, অধিকক্ষণ লিঙ্গোদ্রেক—তাহাতে হয়ত সমস্ত রাত্রিই জাগিয়া থাকিতে হয়, পরে প্রচুর পরিমাণে রেতঃস্খলন হয়, অবসন্ন হইয়া পড়ে।

এসিড ফস প্রথমে মানসিক দৌর্বল্য পরে শরীর আক্রান্ত হয়, যে সকল যুবক শীঘ্র শীঘ্র বেড়ে ওঠে যাদেরকে অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করতে হয় ইহা তাদের পক্ষে অধিক উপযোগী। স্বাস্থ্যভঙ্গ, অতিরিক্ত দুঃখ, ভালোবাসায়  বঞ্চিত কিংবা শরীরের তেজস্কর পদার্থের ক্ষয়হেতু যখন শরীর নষ্ট হবার সম্ভাবনা তখনই ইহাকে স্মরণ করিবেন।

Antidote : ক্যামফর, কফি, স্ট্যাফি।

পরবর্তী ওষধ:  চায়না, ফেরম, সেলিনি, লাইকো, নক্স, সলফ, বেল, কষ্টি, আর্স।


এসিড-পিক্রিক—ডাঃ ন্যাস বলেন, স্নায়ু-দৌর্বল্যের যতগুলি ভাল ভাল ঔষধ আছে—“অতিশয় ইন্দ্রিয়চালনা" পীড়ার কারণ হইলে- পিক্রিক-এসিড প্রায় সকল ঔষধের শীর্ষস্থানীয়। যেখানে এই এসিডের প্রয়োজন তথায় রোগীর সর্বদাই মন মরা, কেবলমাত্র শুইয়া থাকিতে ইচ্ছা, উদাসীনতা, চক্ষে অন্ধকার দেখা, সকল কার্যেই স্পৃহাশূন্যতা, পা সর্বদাই ভারী বোধ এবং কোমরে বেদনা ও গায়ে জ্বালা অনুভব করা, কোন বিষয়ে মনসংযোগ করিতে না পারা, এই লক্ষণগুলি স্পষ্ট সমাবেশ দেখা যায়। ক্রম-- ষষ্ঠ হইতে সিএম শক্তি


স্ট্যানম: শারীরিক ও মানসিক অত্যধিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা, পক্ষাঘাতের মত দুর্বলতা গলা ও বক্ষস্থলের অত্যধিক দুর্বলতার জন্য কথা কহিতে হাসিতে জোরে পাঠ করিতে কষ্টবোধ। উপর হইতে নিচে নামিতে হইলে যেন মূর্চ্ছার মত হয় কিন্তু উপরে উঠিতে তত কষ্ট হয় না।


এনাকার্ডিয়ম: ডক্টর হিউজেস বলেন-- জ্ঞাতসারেই হোক অথবা অজ্ঞাতসারেই হোক ক্রমাগত শুক্রক্ষরণ বা বীর্যস্খলন হেতু স্নায়ু দুর্বলতা ও স্মৃতিশক্তির হ্রাস হইলে উপকারী। (প্রত্যহ প্রাতে সেবনে আশাতীত উপকার হয়।)

Antidote: ক্লিমেটিস, ক্রোটন, কফি, জগ- ল্যান্স রানান-বালবো, রাসটক্স,

 পরবর্তী ঔষধ:  লাইকো, প্ল্যাটিনা, পলস।

 ক্রম: ৬- ৩০ 

অম্লশূল বেদনায় ২০০ বা আরো উচ্চশক্তি উপকারী।

Read More

Sunday, 8 January 2023

বৌদ্ধ দর্শনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। (Give a brief sketch of Bauddha Philosophy.)

1 comment

 বৌদ্ধ দর্শনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। (Give a brief sketch of Bauddha Philosophy.) 


উঃ খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে হিমালয়ের পাদদেশে কপিলাবস্তু নগরে এক রাজ পরিবারে জন্ম নিলেন বুদ্ধ। পরিবার থেকে নাম রাখা হল গৌতম। রাজা ঐশ্বর্যের মাঝে গৌতম হাপিয়ে উঠলেন দিনের পর দিন। জরা, ব্যাধি, মৃত্যুর দৃশ্য দেখে তাঁর উপলব্ধি হল এ সংসার দুঃখময়। একদিন চোখের সামনে দাঁড়াল এক সন্ন্যাসী- সৌম্য, দিব্য, আনন্দময়। মুগ্ধ হলেন গৌতম। ভাবলেন সন্ন্যাস গ্রহণই দুঃখ-বেদনা থেকে মুক্তির উপায়। রাজার কুমার রাজপ্রসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন। তখন তাঁর ঊনত্রিশ বছর বয়স। এরপর দীর্ঘকাল গয়ায় বোধিবৃক্ষতলে গভীর ধ্যান ও সাধনার মাধ্যমে সত্যের সন্ধান পেলেন। দুঃখের রহস্য উন্মোচিত হল। সম্যক জ্ঞান লাভ করলেন তিনি। সত্যের স্বরূপ জেনে তিনি হলেন তথাগত। বিশ্ববাসীকে দুঃখকষ্ট থেকে চিরমুক্ত করার জন্য তিনি তাঁর ধ্যানলব্ধ জ্ঞান প্রচারে হলেন অগ্রণী। তাঁর ধর্মবাণী ছড়িয়ে পড়ল দিক-দিগন্তে। অহিংসা, প্রেম করুণার ধারায় শুচিস্নান করল পৃথিবী। আশি বছর বয়সে তিনি নির্বাণ লাভ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর বৌদ্ধধর্ম ধীরে ধীরে এক বিশ্বধর্মে পরিণত হল।


দার্শনিক বলতে আমরা সাধারণভাবে যা বুঝে থাকি, বুদ্ধদের ঠিক সেই অর্থে দার্শনিক নন। করুনাঘন মুগ্ধ ছিলেন ধর্ম ও নীতিতত্ত্বের প্রচারক। তাত্ত্বিক আলোচনায় বুদ্ধদের উৎসাহী ছিলেন না। বুদ্ধদেব ছিলেন সত্যদ্রষ্টা। আধ্যাত্মিক চেতনার গভীরে তার দৃষ্টি ছিল সমাহিত। তিনি ছিলেন জীবনবাদী মহাপুরুষ। জগতের সৃষ্টি তত্ত্বের যে সব দার্শনিক প্রশ্ন রয়েছে, তা নিয়ে কালহরণ না করে তিনি দুঃখজর্জর মানুষকে মুক্তির উপায় বলে দিতেন। 


বুদ্ধদেবের নিজের রচিত কোন গ্রন্থ ছিল না। তিনি কথোপকথনের মাধ্যমে শিষ্যদের উপদেশ দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তার উপদেশগুলি শিষ্যরা পালি ভাষায় গ্রন্থের আকারে ধরে রাখলেন। গ্রন্থগুলি হল 'পিটক। এই পিটকের সংখ্যা তিনটি—বিনয় পিটিক, সুত্র পিটক ও অভিধৰ্ম্ম পিটক। এগুলিকে ত্রিপিটক বলা হয়। 


সাধনার শীর্ষে গিয়ে বুদ্ধদের চারটি সত্যের সন্ধান পেয়েছিলেন। বৌদ্ধ দর্শনে এ চারটি সত্য চারটি আসিতা আর্যসত্য নামে পরিচিত। এ চারটি সত্য হল : (১) দুঃখ, (2) দুঃখ- সমুদায়, (৩) দুঃখ-নিরোধ ও (৪) দুঃখ-নিরোধ মার্গ।


প্রথম আর্যসত্য : 'সর্বং দুঃখম্'—সবই দুঃখময়। জনমে মরণে দুঃখ। আকাঙ্ক্ষায়, উৎকণ্ঠায়, হতাশায় দুঃখ। প্রিয়-বিচ্ছেদে, অপ্রিয়-সংযোগে দুঃখ। যা অনিত্য তা দুঃখে ভরা। কোথাও আনন্দ নেই, সুখ নেই। সুখের মাঝেই দুঃখের বীজ লুকিয়ে রয়েছে। সমস্ত পৃথিবীটাই একটা বিরাট আগুনের কুণ্ড। সমস্ত জীব জরা-ব্যাধি-মৃত্যুর দুঃখের আগুনে পুড়ে পুড়ে মরছে।


দ্বিতীয় আর্যসত্য : দুঃখ সমুদায়' বা দুঃখের কারণ আছে। বুদ্ধদেবের দ্বিতীয় আর্যসত্যটি 'প্রতীত্যসমুৎপাদ' বা কার্যকারণ সম্পর্কের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রতীত্যসমুৎপাদ নিয়ম অনুযায়ী এ পৃথিবীতে যে কোন ঘটনার পশ্চাতেই কোন-না-কোন কারণ আছে। কারণ ছাড়া কোন ঘটনা ঘটতে পারে না। দুঃখেরও কারণ আছে। জরা মরণের কারণ হল জাতি (জন্ম)। জাতির কারণ হল ভব (পুনরায় জন্মগ্রহণের বাসনা)। ভব'র কারণ হল উপাদান (সাংসারিক বস্তুর প্রতি আসক্তি)। উপাদানের কারণ হল তৃষ্ণা (বিষয় ভোগের ইচ্ছা)। তৃষ্ণার কারণ বেদনা (পূর্ববর্তী ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা)। বেদনার কারণ স্পর্শ (বস্তুর সাথে ইন্দ্রিয়ের সংযোগ)। স্পর্শের কারণ ঘড়ায়তন (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক ও মন)। ষড়ায়তনের কারণ হল নামরূপ (দেহ-মন গ্রন্থি)। নামরূপের কারণ হল বিজ্ঞান (চৈতন্য)। বিজ্ঞানের কারণ হল সংস্কার (পূর্ব জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ)। সংস্কারের কারণ হল অবিদ্যা (চারটি আর্যসত্তা বিষয়ে প্রকৃত জ্ঞানের অভাব)। কার্যকারণ শৃঙ্খলের এই বারোটি অঙ্গকে 'দ্বাদশ নিদান' বলা হয়।


তৃতীয় আর্যসত্য : ‘দুঃখ-নিরোধ'। দুঃখের যে সব কারণ আছে সেই কারণগুলি দূর করলেই দুঃখ-নিরোধ সম্ভব। দুঃখ নিবৃত্তিই নির্বাণ। নির্বাণ হল মুক্তি — দুঃখ থেকে চিরমুক্তি। এ জীবনেই নির্বাণ লাভ করা যায়। 


চতুর্থ আর্যসত্য : 'দুঃখ-নিরোধ মার্গ। যে পথ ধরে নির্বাণ লাভ করা যায় বা দুঃখ থেকে চিরমুক্তি পাওয়া যায়, তাই হল দুঃখ-নিরোধ মার্গ। এ পথের নাম 'অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এই মার্গের আটটি স্তর হল: (১) সম্যক দৃষ্টি। চারটি আর্যসত্যের প্রকৃত জ্ঞানই সম্যক দৃষ্টি। (২) সম্যক সঙ্কল্প। সত্যের জ্ঞানালোকে জীবন নিয়ন্ত্রণ করা ও কর্ম করার দৃঢ় ইচ্ছাই সম্যক সঙ্কল্প। (৩) সম্যক বাক্য। সত্য ভাষণ, প্রিয় কথন, শিষ্ট আলোচনা, সংযত আলাপ, মধুর বাক্য বিনিময়ই বাক্ সংযমের লক্ষণ। (৪) সম্যক কর্মান্ত। জীবহত্যা, চুরি করা, ইন্দ্রিয় সেবা থেকে বিরত হওয়া। (৫) সম্যক আজীব। উদ্দেশ্য ও উপায় উভয়কেই সৎভাবে রেখে জীবনযাত্রা নির্বাহ করা। (৬) সম্যক ব্যায়াম। মনে সৎ চিন্তার উদয় ও স্থিতিতে প্রযত্ন ও প্রচেষ্টা। (৭) সম্যক স্মৃতি। জীবন ক্ষণস্থায়ী, জগৎ অনিত্য, সব কিছু পরিবর্তনশীল—এ বিষয় জ্ঞানে-স্মরণে-মননে ধরে রাখা। (৮) সমাক সমাধি। একাগ্রচিত্তে মনঃসংযোগের নামই সমাধি।


যদিও বুদ্ধদেব তাত্ত্বিক আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ করতেন না তবুও তাঁর নৈতিক শিক্ষার মূলে কতকগুলি দার্শনিক তত্ত্ব নিহিত, যেগুলি হল— (১) প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি, (২) কর্মবাদ, (৩) অনিত্যবাদ (৪) নৈরাত্ম্যবাদ


(১) প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি অনুসারে জগতের প্রতিটি বস্তু বা ঘটনার পূর্ববর্তী 'কারণ' আছে। জগতে কোন কিছুই আকস্মিক ভাবে ঘটে না। জগতের কোন পরিণতির কারণ থাকতে পারে না।


(২) কর্মবাদ অনুসারে সংসারে যে যেমন কর্ম করবে সে তেমন কর্মফল ভোগ করবে। কর্ম দুই প্রকার—সকাম ও নিষ্কাম। সকাম কর্ম মোহযুক্ত ও নিষ্কাম কর্ম মোহমুক্ত। সকাম কর্ম ফলপ্রসূ হয়, কিন্তু নিষ্কাম কর্ম ফলপ্রসূ হয় না।


(৩) অনিত্যবাদ অনুসারে জগতে কোন কিছুই চিরন্তন নয়। সবই অনিতা, সবই ধ্বংসশীল। পরবর্তীকালে বুদ্ধ অনুগামীরা বুদ্ধদেবের অনিত্যবাদকে ক্ষণিকবাদে পরিণত করেন। ক্ষণিকবাদের বক্তব্য বিষয় হল, এক ক্ষণের বেশি কোন কিছুই স্থায়ী হয় না (সর্বং ক্ষণিকং সত্তাৎ)।


(৪) নৈরাত্ম্যবাদ অনুসারে কোন নিত্য বা চিরন্তন আত্মার অস্তিত্ব নেই, যেহেতু সব কিছুই অনিত্য। আত্মা হল চেতনার বিরামবিহীন প্রবাহ। এক জন্ম থেকে আর এক জন্মে মানসিক প্রক্রিয়া প্রবাহিত, তাই এ জীবন থেকে পরবর্তী জীবনে উত্তরণ ঘটার স্বাভাবিকতাতেই জন্মান্তর স্বীকৃত। কিন্তু জন্মান্তর মানে এরকম নয় যে নিত্য আত্মার নতুন দেহ ধারণ। চেতনার অবিরত প্রবাহের আড়ালে কোন নিত্য আত্মার অস্তিত্ব থাকাতে পারে না।


বৌদ্ধ দর্শনে ঈশ্বরকে স্বীকার করা হয় না। বৌদ্ধমত হল কোন অপরিণামী কারণ হিসাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে সাধারণত যে সব প্রমাণ দেওয়া হয় সেগুলি বৌদ্ধমত অনুযায়ী যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নয়। এমন কি নৈতিক প্রগতির জন্যও ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করার কোন প্রয়োজন নেই। মোক্ষলাভের জন্যও মোক্ষদাতারূপে ঈশ্বরকে মেনে নেওয়ার কোন যুক্তি নেই, যেহেতু অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুসরণই মোক্ষলাভের উপায়।


বুদ্ধদের যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন তাঁর শিষ্যমণ্ডলী তার নির্দেশ অনুসরণ করে দার্শনিক তত্ত্বের আলোচনা থেকে বিরত ছিলেন। তাঁর তিরোভাবের পর বুদ্ধের শিক্ষা ও উপদেশের উপর ভিত্তি করে নানা দার্শনিক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিল। বুদ্ধের শিষ্যমণ্ডলী বৌদ্ধ ধর্মকে দর্শনের সুদৃঢ় ভিত্তিভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিজেদের নিয়োজিত করলেন এবং এর ফলে চারটি উল্লেখযোগ্য দার্শনিক সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। সম্প্রদায়গুলি হল যথাক্রমে- (১) মাধ্যমিক বা শূন্যবাদী সম্প্রদায়, (২) যোগাচার সম্প্রদায়, (৩) সৌত্রান্তিক সম্প্রদায় ও (৪) বৈভাষিক সম্প্রদায়।


(১) মাধ্যমিক বা শূন্যবাদী সম্প্রদায় : এই সম্প্রদায়ের মতে জড়জগৎ ও মনোজগৎ কোন কিছুরই সত্তা নেই—সবই শূন্য। পাশ্চাত্ত্য দার্শনিক ডেভিড হিউম (Hume)-এর মতবাদের সঙ্গে এই মতবাদের যথেষ্ট সঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায়। মাধ্যমিক দর্শনের প্রবর্তক হলেন নাগার্জুন।


(২) যোগাচার সম্প্রদায় : এই সম্প্রদায় অনুসারে বাহ্যবস্তুর স্বতন্ত্র সত্তা নেই। চেতনার সত্তা আছে। চেতনার বাইরে বস্তুর অস্তিত্ব আছে মনে করলে তা চেতনারই ভাব বা ধারণা মাত্র। চিন্তার সত্যতা প্রমাণ করতে গেলেও চেতনা বা মনের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতেই হবে। চিত্ত বা মন হল বিজ্ঞান-ধারা। জ্ঞানের বিষয় ব্যক্তি মনের ভাব ছাড়া আর কিছু নয়। যোগাচার মতকে বিজ্ঞানবাদ বলা হয়। এই মতবাদের সঙ্গে পাশ্চাত্য দার্শনিক বার্কলি (Berkeley)-র মতবাদের যথেষ্ট মিল আছে। অসঙ্গ, বসুবন্ধু প্রভৃতি দার্শনিকগণ যোগাচারবাদের প্রতিষ্ঠাতা।


(৩) সৌত্রান্তিক সম্প্রদায় ঃ সৌত্রান্তিকগণ সর্বাস্তিবাদী। এঁরা বাহ্যবস্তু ও মন উভয়েরই স্বতন্ত্র সত্তা স্বীকার করেন। সৌত্রান্তিকগণ বলেন, বাহ্যবস্তুর মনোনিরপেক্ষ সত্তা আছে। বাহ্যবস্তুর প্রকৃত অস্তিত্ব না থাকলে বাহ্যবস্তু সম্পর্কে ভ্রান্ত প্রত্যক্ষের ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাহাবস্তুর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব না থাকলে বিভিন্ন চেতনার পার্থক্য ব্যাখ্যা করা যায় না। বাহ্যবস্তুর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিশ্চয়ই আছে তা না হলে বস্তুর ধারণা বস্তু অনুযায়ী হয়েছে কিনা তা কিভাবে বোঝা যাবে? যেহেতু বস্তু আমাদের প্রয়োজন সিদ্ধ করে, তাই বাহ্যবস্তুর অস্তিত্ব মেনে না নেওয়া ছাড়া আমাদের উপায় নেই। যেহেতু ঘট ও ঘটের চেতনা সমকালীন, এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত নয় যে, ঘট (বস্তু) ও ঘটের চেতনা (বস্তুর চেতনা) অভিন্ন। অতএব বস্তু আছে বলেই আমরা বস্তুর ধারণা করি। এই মতবাদই বাহ্যানুমেয়বাদ। পাশ্চাত্য দার্শনিক জন লক (Locke) এই ধরনের মতবাদ প্রচার করেছেন। সৌত্রান্তিক সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে কুমার লাত-এর নাম প্রসিদ্ধ। 

(৪) বৈভাষিক সম্প্রদায় : বৈভাষিক সম্প্রদায় বাহ্যবস্তু ও মন উভয়েরই অস্তিত্ব স্বীকার করেন। সৌত্রান্তিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে এঁরা একমত। এঁদের মধ্যে ভিন্ন মত হল একটি প্রধান বিষয় নিয়ে ঃ সৌত্রান্তিকগণ যেখানে বলেন বাহ্যবস্তুকে প্রত্যক্ষ করা যায় না, তার অস্তিত্ব অনুমানের সাহায্যে জানতে পারা যায়। বৈভাষিকগণ সেখানে বলেন বাহ্যবস্তু প্রত্যক্ষগ্রাহ্য – অর্থাৎ সাক্ষাৎভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়, কিন্তু অনুমানসিদ্ধ নয়। বৈভাষিকদের বাহ্যপ্রত্যক্ষবাদ বলা হয়। পাশ্চাত্য দর্শনে সরল স্বাতন্ত্রবাদীদের (Naive Realists) মতবাদের সঙ্গে এই মতবাদের সামঞ্জস্য আছে। 

কালক্রমে বৌদ্ধরা ধর্মের দিক থেকে দুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যান— হীনযান ও মহাযান। প্রাচীনপন্থীরা হলেন হীনযান, যারা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের আচার-আচরণের বিধিগত কঠোরতা শিথিল করতে নারাজ। প্রাচীনপন্থীদের থেকে সরে এসে উদারপন্থীরা ধর্মের দিক থেকে মহাযান সম্প্রদায় গড়ে তুললেন। হীনযানদের ধর্মসাহিত্য রচিত হল পালি ভাষায় আর সংস্কৃত ভাষায় রচিত হল মহাযানদের ধর্মসাহিত্য। হীনযানীদের কাছে আত্মমুক্তি নির্বাণলাতের উদ্দেশ্য, মহাযানীদের কাছে সবার মুক্তি নির্বাণলাভের উদ্দেশ্য। মহাযানীরা মনে করেন, পরন জ্ঞান লাভ করাই নির্বাণের লক্ষ্য এবং ঐ পরম জ্ঞানের দ্বারা দুঃখ জর্জর মানুষের মুক্তিলাভে সহায়তা করাই নির্বাণের আদর্শ। হীনযানীদের প্রাধান্য বিস্তার ঘটেছিল সিংহল, শ্যাম ও ব্রহ্মাদেশে, মহাযানীদের প্রসার ঘটে তিব্বত, চীন, জাপানে।

<<<<<<<<<<<>>>>>>>>>

Read More